সফল ঘটক পাখি ভাই

ঘটক, ঘটকালি ও বিয়ে—এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়েই চোখে পড়ল লম্বা ছড়াটা। ছড়ার নায়ক ঘটক আনন্দরাম। ছড়াকার শ্রী সমর কুমার তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে, ‘পাত্র-পাত্রী যেমনটি চান, ভাবনা কিছুই নাই/ জুটিয়ে দেবেন আনন্দরাম, যেমনটি ঠিক চাই/ আনন্দরাম ভালই জানেন আপন কর্মধারা,/ খুঁতের সাথে খুঁত মিলিয়ে দুইটি হৃদয় জোড়া/ এই ভাবেতে শতশত বিয়ে দিয়ে তিনি/ ঘটক কুলে পরিচিত ঘটক চূড়ামণি।’

আজ যে ঘটক চূড়ামণি পাঠকের সামনে হাজির, তিনি কাজী আশরাফ হোসেন। জন্ম ১৯৪৩ সালে বরিশালে। এখন পর্যন্ত সাড়ে ১৮ হাজার জুড়ি মিলিয়েছেন। বাংলাপিডিয়ায় ঘটকের পরিচয় যেভাবে দেওয়া হয়েছে, সে থেকে তাঁর জীবন অনেকটাই আলাদা। বাংলাপিডিয়া বলছে, প্রাচীনকালে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ঘটকের পেশা গ্রহণ করতেন। তাঁরা কুলাচার্য নামে পরিচিত ছিলেন।

১৩, ১৫ ও ১৮ শতকের কোনো কোনো ঘটকের নাম পাওয়া যায় ইতিহাসে। বলা হয়, বাংলায় কৌলীন্য প্রথার উদ্ভবে তাঁদের বড় ভূমিকা ছিল। ছেলেমেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় লোকে উচ্চ বংশ খোঁজ করত। আর এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকত ঘটকদের কাছে। কেন কাজী আশরাফ হোসেনের গল্পটা আলাদা, তা জানতে যেতে হবে অনেকগুলো বছর আগে। তিনি তখন কাজ করতেন খুলনা কাগজকলে।

উচ্চশিক্ষিত নন, কাগজের মণ্ড তৈরি হতো যেখানে, সেখানে খাটাখাটুনির কাজ করতেন। শখের বশে ওখানেই এক সহকর্মীর ঘটকালি করলেন। পাত্র–পাত্রী মিলে গেল। এটা ষাটের দশকের কথা। আবারও এক সহকর্মীর বিয়ের কথাবার্তার শুরুতে ডাক পড়ল তাঁর। এবারেও সফল। এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ল। ছন্দপতন হলো ১৯৭১ সালে।

সারা দেশ যখন স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ, তখন শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। কাগজকলের চিকিৎসক জরুরি অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলেন। অস্ত্রোপচার শেষে কারখানা তাঁকে ‘আনফিট’ করে দিল। বাড়ি ফিরতে হলো। ১৭ বছর বয়সে বিয়ে করেছেন তিনি। স্ত্রী আছেন, সন্তান ছোট।

আশরাফ বলে যান, ‘রুজি করা দরকার, বুঝলাম। অভিজ্ঞতা বলতে কটা ঘটকালি আর পুঁজি তিন-চার শ টাকা। এই নিয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় চলে আসলাম।’ ঢাকায় এসে আশরাফ আশ্রয় নিলেন সদরঘাটের নৌকায়। ওখানে তখন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। গল্পে-আড্ডায় লোকজনকে জানাতে শুরু করলেন যে তিনি বেশ কিছু জুড়ি মিলিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের পর বর-কনে সুখে-শান্তিতে আছেন। একটা-দুটি ডাক পেতে শুরু করলেন।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বর বা কনেপক্ষ নিজেরাই পাত্র-পাত্রী পছন্দ করে তাঁকে খোঁজখবর নিতে বলতেন। আস্থা অর্জন করলেন আশরাফ। পাত্র-পাত্রীর খোঁজে আজ পুরান ঢাকা তো কাল মিরপুর, কখনো সিলেট, আবার কখনো পটুয়াখালী বা উত্তরবঙ্গের কোথাও। লোকে বলতে শুরু করল কাজী আশরাফ হোসেন পাখির মতো ওড়েন।

একজন-দুজন তাঁকে পাখি ভাই নামে ডাকতেই শুরু করে দিলেন। একপর্যায়ে নামই বদলে গেল তাঁর। কাজী আশরাফ হোসেন হয়ে গেলেন পাখি ভাই বা ঘটক পাখি ভাই। গল্পের এখানটা থেকে শেষ অবধি তাঁকে পাখি ভাই-ই বলা হবে। কারণ, পাখি ভাইয়ের এই নামটাই প্রিয়। তাঁর ভাষায়, এ নামটাই ‘লক্ষ্মী’।

ঘটকালি ব্যবসায় যখন পসার পেতে শুরু করেছেন, তখন নৌকা ছেড়ে ডাঙায় পুনম হোটেলে উঠে এলেন তিন শ টাকা মাস চুক্তিতে। তখনো ব্যবসাটা ঠিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। যে যা দিত, তা–ই নিতেন। বর-কনের খোঁজ নিতে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার খরচটা পেতেন, বিয়ে হলে মিলত মোটা অঙ্কের টাকা।

শুধু খোঁজখবর নিয়েই কাজ সারতেন না, বর-কনের দেখা–সাক্ষাতের ব্যবস্থাও করে দিতেন তিনি। যে সময়ের কথা বলছিলেন পাখি ভাই, সেটা সত্তর দশকের শেষ ভাগ। ওই সময়ে নিউমার্কেট, মৌচাক মার্কেট আর সেঞ্চুরি আর্কেডে দেখাদেখিটা হতো বেশি। পাখি ভাইয়েরও ওসব জায়গায় ছিল নিত্য আনাগোনা।

এবার তিনি কাজের কৌশল বদলালেন। ভাবলেন, ঘটকালিই যখন তাঁর পেশা, এটাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলে ক্ষতি কী। অনেক ভেবেচিন্তে এক ব্যাংক কর্মকর্তার পরামর্শে ৭৮-৭৯ সালের দিকে ইত্তেফাক পত্রিকায় ৫০ টাকায় বিজ্ঞাপন দিলেন। প্রথম প্রথম বিজ্ঞাপন দেখে লোকে হাসত। কিন্তু সাড়াও মন্দ ছিল না। এবার তাঁর একটি ফোন দরকার।

বিজ্ঞাপনের সঙ্গে টেলিফোন নম্বর জুড়ে দিলে সাড়া পাওয়া যাবে ভালো—এমনই আশা তাঁর। প্রভাবশালী পরিবারে ঘটকালি করেছিলেন, তাঁদের তদবিরে একবারে দুটি টেলিফোন নিয়ে ফেললেন তিনি। তত দিনে মানুষের রুচি বদলাচ্ছে, নতুন নতুন শপিং মল হচ্ছে। হোটেলে বর-কনের দেখাদেখিটা আর ভালো দেখাচ্ছিল না। ১৯৮৫ সালে ঘটক পাখি ভাই ইস্টার্ন প্লাজায় অফিস ভাড়া নিলেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

৩৪ বছর ধরে ইস্টার্ন প্লাজাতেই আছেন। ছোট্ট এক কামরা থেকে এখন দুটি অফিস নিয়েছেন। সপ্তাহে সাত দিনই খোলা। কর্মীরা সবাই নারী। একেকজন কাজ করছেন ৯-১০ থেকে ১৪-১৫ বছর ধরে। সবাই ঘটক পাখি ভাইকে আঙ্কেল বলে ডাকেন। বললেন, কাজটি মজার। সম্পর্ক গড়ে দেওয়া। কথাবার্তা চালানোর মধ্যে কোনোটি যখন লেগে যায়, তখন আর আনন্দের সীমা থাকে না। বিয়ে পর্যন্তই কাজ, তা কিন্তু নয়। অনেকে পরেও যোগাযোগ রাখেন। এক পরিবারে ২৬টি পর্যন্ত বিয়ে দেওয়ার রেকর্ড আছে ঘটক পাখি ভাইয়ের।

আজকালকার যুগে যখন মুঠোফোনে ডেটিং অ্যাপ পর্যন্ত আছে, ছেলেমেয়েরা হরদম নিজেদের পছন্দে বিয়ে করছেন, সেখানে ঘটকালিটা একটু সেকেলে হয়ে গেল না? জবাবে পাখি ভাই বললেন, বিয়ে হলো আল্লাহর কুদরত। এমন অনেক ছেলেমেয়ে আছেন, যাঁরা শুধু লেখাপড়াটাই করেছেন, সম্পর্ক গড়ার সুযোগ পাননি, অনেকে এখনো পরিবারের অমতে বিয়ে করতে চান না।

এখন হাতে তাঁর দুই হাজার ফাইল। ডিসেম্বরে বিয়ে দিয়েছেন ৩৬টি। যাঁরা বর বা কনে খুঁজছেন, একবার নিবন্ধন ফরমে নাম ওঠাতে তাঁদের খরচ ১০ হাজার টাকা। বিয়ে হলে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তবে অতিদরিদ্রদের কথা আলাদা। এত বছর ধরে ঘটকালিতে। কীভাবে টিকে আছেন?

ঘটক পাখি ভাই বললেন, তিনি তিনটি জিনিস মানেন, ১৮ বছরের নিচে বিয়ের সম্বন্ধ করেন না; যে বিয়েতে পাত্রপক্ষ যৌতুক চায়, সে বিয়ে এড়িয়ে যান। আর কখনো কেউ মিথ্যা বললে সম্পর্ক নিয়ে এগোন না। মিথ্যার ওপর সম্পর্ক টেকে না—এই তাঁর বিশ্বাস। ঘটকালিকে পেশা হিসেবে নেওয়া এবং এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ায় পাখি ভাই অগ্রগণ্য। তবে এই কাজে যুক্ত হয়েছেন আরও অনেকে। তাঁরা এই সেবাকে করেছেন যুগোপযোগী ও আধুনিক।

পাঠকদের এই ফাঁকে মুযম্যাচের কথা জানিয়ে রাখি। এর প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশ উদ্যোক্তা শাহজাদা ইউনুস। ‘মুসলিমা ডোন্ট গেট, উই ম্যারি’ স্লোগান নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। জানা গেল ব্যতিক্রমী এই অ্যাপ চালু করে তিনি সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াই কম্বিনেটরকে পাশে পেয়েছেন।

বাংলাদেশেও এখন ঘটকালির অনলাইন ভিত্তিক মঞ্চগুলো জনপ্রিয়। বরবঁধু ডট কমের মঞ্জুরুল করিম খান জানালেন, তাঁর নিবন্ধিত গ্রাহকের পরিমাণ দু লাখ। তিন মাসের জন্য চার হাজার টাকা ফি দিতে হয়, এর মধ্যে জুড়ি না মিললে আবার নবায়ন করতে হয় সদস্যপদ। তাসলিমা ম্যারেজমিডিয়াযর ফেসবুকে অনুসারী এক লাখ ৭১ হাজার।

প্রতিষ্ঠানটির অনলাইন পরিচালনা করেন নীলুফার ইয়াসমিন। তিনি জানালেন, এর স্বত্বাধিকারী তাসলিমা একসময় ঘটকালির কাজ করতেন। প্রতিষ্ঠানগুলো লাভে আছে। ক্ষতিতে নেই কেউই। এই খবর সরকারের কানেও পৌঁছেছে। আর লাভজনক বিবেচনায় ট্যাক্স বসেছে ঘটকালি পেশায়। তত্যসূত্র: প্রথমআলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *